স্থানীয় বায়ু: ভূপৃষ্ঠের একটি নির্দিষ্ট স্থানে যখন ভূপ্রকৃতি, মৃত্তিকা, শিলার প্রকৃতি, উদ্ভিদের আচ্ছাদন, বায়ুর উন্নতা প্রভৃতির তারতম্যে স্থানীয়ভাবে বায়ুচাপের তারতম্য হয়, তখন সেখানকার উচ্চচাপ এলাকা থেকে নিম্নচাপ এলাকার দিকে এক ধরনের বায়ু প্রবাহিত হয়। স্থানীয় কারণে উৎপত্তি হয় বলে এদের স্থানীয় বায়ু বলা হয়। বায়ুর প্রকৃতি অনুসারে স্থানীয় বায়ুকে দু-ভাগে ভাগ করা যায়-উয় বায়ু এবং শীতল বায়ু।

কয়েকটি স্থানীয় বায়ু: কয়েকটি স্থানীয় বায়ু হল-
1. লু: গ্রীষ্মকালে দিনেরবেলা উত্তর-পশ্চিম ভারতের ভূভাগ যখন প্রচণ্ড উত্তপ্ত হয়, তখন ওই উত্তপ্ত ভূপৃষ্ঠের সংস্পর্শে এসে ভূপৃষ্ঠসংলগ্ন বায়ুও প্রচণ্ড উত্তপ্ত হয়ে প্রবল বেগে ভূপৃষ্ঠের সমান্তরালে প্রবাহিত হয়। এইরূপ প্রচণ্ড উয় ও শুষ্ক বাতাসকে বলা হয় লু। সাধারণত এই বায়ুর উন্নতা থাকে 43° সে-48°সে। গ্রীষ্মের দুপুরে বা অপরাহ্নে পাঞ্জাব, হরিয়ানা, রাজস্থান, দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ প্রভৃতি রাজ্যে এই ‘লু’ তাপপ্রবাহ রূপে বয়ে যায়। সন্ধ্যার পর এই বায়ুর তীব্রতা অনেক কমে যায়। তবে প্রচণ্ড উত্তপ্ত এই বায়ুর প্রভাবে মানুষ-সহ বহু গবাদিপশু মারা যায়।

2.ফন: ইউরোপের আল্পস পার্বত্য অঞ্চলের উত্তর (অনুবাত) ঢাল বেয়ে যে উয় ও শুষ্ক বায়ু নীচের দিকে নেমে রাইন নদী উপত্যকার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়, তাকেই বলে ফন বায়ু। এর ফলে কোনো কোনো সময়ে উপত্যকার উয়তা 24 ঘণ্টার মধ্যে প্রায় 15° সে-20° সে পর্যন্ত বেড়ে যায়। এই উন্ন বায়ুর সংস্পর্শে পর্বতের বরফ গলে যায় এবং ওই বরফগলা জলে পার্বত্য উপত্যকায় তৃণভূমির সৃষ্টি হয়।
3. চিনুক: উত্তর আমেরিকার রকি পার্বত্য অঞ্চলের পূর্ব ঢাল থেকে যে উয় ও শুষ্ক বায়ু প্রেইরি সমভূমিতে নেমে আসে তার নাম চিনুক। ইংরেজি ‘chinook’ শব্দের অর্থ ‘snow eater’ বা ‘তুষার ভক্ষক’। শীতকালে এই বায়ুর প্রভাবে রকি পর্বতের পাদদেশ-সহ সমগ্র অঞ্চলের তুষার গলে যায় বলে প্রেইরি অঞ্চলে বিস্তীর্ণ তৃণভূমি সষ্টি হয়েছে।
4. সিরোক্কো: গ্রীষ্মকালে আফ্রিকার সাহারা মরুভূমির উত্তরাংশ থেকে একপ্রকার অতি উয়, শুষ্ক ও ধুলোপূর্ণ বায়ু উৎপন্ন হয়ে উত্তরে ভূমধ্যসাগরের দিকে প্রবাহিত হয় এবং তারপর ভূমধ্যসাগর অতিক্রম করে ইউরোপের দক্ষিণ প্রান্তে পৌঁছে যায়। ইটালির সিসিলিতে এই বায়ুকে বলে সিরোক্কো। আফ্রিকার উত্তর উপকূল পর্যন্ত এই বায়ু উন্ন ও শুষ্ক থাকলেও ভূমধ্যসাগর অতিক্রম করার পর যথেষ্ট আর্দ্র ও মনোরম হয়ে যায় (ভূমধ্যসাগর অতিক্রম করার আগে মিশরে এই বায়ুটিকেই বলে খামসিন।)
5. মিস্ট্রাল: শীতকালে ইউরোপের আল্পস পর্বত থেকে দক্ষিণে ফ্রান্সের রোন নদী উপত্যকার দিকে যে শীতল ও শুষ্ক বায়ু প্রবাহিত হয়, তাকে বলে মিস্ট্রাল। এটি অত্যন্ত শীতল ও শুষ্ক বায়ু। তাই এই বায়ুর প্রভাবে রোন উপত্যকার তাপমাত্রা যথেষ্ট কমে যায় এবং কনকনে ঠান্ডায় জনজীবন তখন বিপর্যস্ত হয়।
6. বোরা: শীতকালে ইউরোপের আল্পস পর্বতের দক্ষিণ ঢাল বেয়ে নীচের দিকে নেমে যে শীতল ও শুষ্ক বায়ু দক্ষিণ ইটালির অ্যাড্রিয়াটিক সাগরের উপকূল অঞ্চলের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়, তাকে বলে বোরা। এই শীতল ও শুষ্ক বায়ুটির প্রভাবে অ্যাড্রিয়াটিক উপকূলে তীব্র শৈত্য প্রবাহের সৃষ্টি হয় এবং তার ফলে স্বাভাবিক জনজীবন বিঘ্নিত হয়।
7. অন্যান্য স্থানীয় বায়ু: ① দক্ষিণ আমেরিকার দক্ষিণ অংশে আন্দিজ পর্বতের পূর্ব ঢাল থেকে যে শীতল ও শুষ্ক বায়ু পম্পাস তৃণভূমির ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়, তাকে বলে পাম্পেরো। ② আফ্রিকার উত্তর-পশ্চিম উপকূলে যে উন্ন, শুষ্ক ও ধূলিপূর্ণ বায়ু প্রবাহিত হয় তাকে হারমাট্টান বলে।