উত্তর: মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘হলুদ গোড়া’ গল্পটি ঘটনা ও চরিত্রের আপাতবিন্যাসে গ্রামজীবনে মানুষের মনে ব্যাপ্ত হয়ে থাকা অন্ধবিশ্বাস ও সংস্কারের প্রতিনিধিত্ব করে, যার পটভূমি নিঃসন্দেহে ভৌতিক।
মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে দুটি খুন এবং তাকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ সমাজের সংস্কারগ্রস্ত গণমানসের নিবিড় উন্মোচন ঘটেছে এই গল্পে। বলাই চক্রবর্তী খুন হওয়ার তিন দিন পরে খুন হয় গ্রামের মেয়ে যোলো-সতেরো বছরের শুভ্রা। বিবাহিতা শুধা বাবার বাড়িতে এসেছিল তার সন্তান হবে বলে। বলাই চক্রবর্তীর মৃত্যু গ্রামের লোকদের কাছে বিস্ময়ের না হলেও শুভ্রার মৃত্যু তাদের বিচলিত ও বিস্মিত করে। কাহিনিতে ভৌতিক আবহের সূচনা হয় প্রথম যখন বলাই চক্রবর্তীর উত্তরাধিকারী তার ভাইপো নবীনের স্ত্রী দামিনীর গায়ে সন্ধ্যাবেলা বাতাস লাগে।
তেঁতুলগাছ থেকে বাহিত মৃদু অথচ দমকা বাতাস গায়ে লেগে ভীত দামিনী অচেতন হয়ে যায়। সেই সুত্র উত্তর: ধরে কাহিনিতে প্রবীণ পঙ্কজ ঘোষালের পরামর্শমত এবং গ্রামের মানুষদের সোৎসাহ সমর্থনে কুঞ্জ গুনিনের আবির্ভাব ঘটে।
ফিজিক্স নিয়ে পড়াশোনা করা শিক্ষক এবং ডিগ্রিহীন চিকিৎসক ধীরেনের আপত্তি গ্রাহ্য হয় না। মন্ত্রতন্ত্র, আচার-আচরণের যে প্রয়োগ দামিনীর উপরে ঘটে, উপস্থিত দর্শকরা যেভাবে সে দৃশ্য উপভোগ করে তার মধ্যে সমাজে সর্বব্যাপ্ত অশ্বসংস্কারই প্রতিফলিত হয়। দামিনী যখন বলে যে সে শুভা এবং বলাই চক্রবর্তী তাকে খুন করেছে তখন যেন গণমানসের প্রত্যাশাই মান্যতা পেয়ে যায়।
পঙ্কজ ঘোষাল কিংবা কুন্তু তার বৈধতা প্রতিষ্ঠা করে দেয়। কিন্তু এই ভৌতিক আবহ তীব্রতম রূপ পায় যখন গল্প শেষে ধীরেন বলাই চক্রবর্তীর আত্মার বাহক হয়ে যায়। এবং জানায় যে, সে শুভাকে খুন করেছে। ব্যক্তিমনের অবচেতনে লুকিয়ে থাকা অন্ধবিশ্বাস একসময়ে সামাজিক অন্ধত্বের সামনে নিজেকে উন্মোচিত করে দিতে বাধ্য হয়।