উত্তর: মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘হলুদ পোড়া’ গল্পটি আপাতভাবে এক ভৌতিক আবহকে অবলম্বন করে রচিত হয়েছে। তিন দিনের ব্যবধানে দুটি মৃত্যু। শুভ্রা চাটুজ্জে আর বলাই চক্রবর্তীর মৃত্যুতে গ্রামের লোকেরা যখন বিচলিত, বিশেষভাবে শুভ্রার মৃত্যুতে, সেইসময় একদিন নবীনের স্ত্রী দামিনীর গায়ে বাতাস লাগে এবং কুঞ্জ গুনিন সিদ্ধান্তে যায় যে, তাকে অশরীরী আত্মা ভর করেছে।
মন্ত্রতন্ত্র প্রয়োগ, কাঁচা হলুদ পুড়িয়ে শোঁকানোর পরে দামিনীর মুখ থেকে শোনা গেল সেই অশরীরীর কণ্ঠস্বর, যে সে শুভ্রা আর বলাই চক্রবর্তী তাকে খুন করেছে। ঠিক একইভাবে কাহিনির শেষ অংশে ধীরেনের মুখে শোনা যায় আর-এক অতিপ্রাকৃত কণ্ঠস্বর তা হল সে বলাই চক্রবর্তী এবং সেই শুধাকে খুন করেছে। অসম্ভবের এইটুকু বিন্যাস ছাড়া বাকি সবটাই চরিত্রদের মনোলোকের উন্মোচন এবং টানাপোড়েন। আর তার পরতে পরতে থাকে অন্ধবিশ্বাস আর সংস্কারের আদিম অন্ধকারে ডুবে থাকা ব্যক্তিমন এবং সমাজমন।
ধীরেন চাটুজ্জে যুক্তিবাদ আর বিজ্ঞানমনস্কতা থেকে বিচ্যুত হয়ে আত্মসমর্পণ করে এই অন্ধবিশ্বাসের কাছে। সমাজমনের প্রবল চাপ হয়তো কার্যকর থাকে তার অবচেতন থেকে উঠে আসা আদিম কণ্ঠস্বরে, সে বলে আমি বলাই চক্রবর্তী, আমি শুন্নাকে খুন করেছি।
পরুকজ ঘোষালের অশ্ববিশ্বাস, ক্ষেপ্তি পিসির ভূত আটকানোর দাওয়াই, স্কুলের প্রধান শিক্ষক, সম্পাদক থেকে ছাত্রদের আচরণের পালটে যাওয়া আসলে সংস্কারে আটকে যাওয়া সমাজমনের বহিঃপ্রকাশ। এই মানসিকতার পৌরোহিত্য করে কুক্ত। তাই চূড়ান্ত বিচারে হলুদ পোড়া কোনো ভূতের গল্প নয়। অবচেতনের অন্ধকার থেকে উঠে আসা সংস্কার-নির্ভর মনস্তত্বের নিখুঁত বহিঃপ্রকাশ।