উত্তরের সমভূমি অঞ্চলের ভূপ্রকৃতি: উত্তরে হিমালয় পার্বত্যভূমি এবং দক্ষিণে উপদ্বীপীয় মালভূমির মধ্যবর্তী এলাকায় গঙ্গা, সিন্ধু, ব্রহ্মপুত্র এবং এদের বিভিন্ন উপনদী ও শাখানদীগুলি পলি সঞ্চয় করে যে বিস্তৃত সমতলভূমি গঠন করেছে, তাকে বলা হয় উত্তরের সমভূমি অঞ্চল। স্থানীয় বৈচিত্র্য অনুসারে এই সুবিস্তৃত অঞ্চলটিকে চারটি উপ-অঞ্চলে ভাগ করা যায়-

1. রাজস্থান সমভূমি: [1] আরাবল্লি পর্বতের পশ্চিমে রাজস্থানের মধ্য ও পশ্চিমাংশের রুক্ষ ও শুষ্ক বালিপূর্ণ মরুময় সমতল এলাকাটি রাজস্থান সমভূমি নামে পরিচিত। এর পশ্চিম ভাগের বিস্তীর্ণ এলাকার নাম মরুস্থলী। এটি থর মরুভূমির অংশরূপে পাকিস্তানের মধ্যে বিস্তৃত হয়েছে। [2] মরুস্থলীর প্রস্তরময় অঞ্চলের নাম হামাদা। সমান্তরাল বালিয়াড়িগুলির মধ্যবর্তী অবনমিত অংশে বায়ুপ্রবাহের অপসরণজনিত কারণে সৃষ্ট গহ্বরে লবণাক্ত জলের হ্রদ দেখা যায়। [3] মরুভূমির চলমান বালিয়াড়িগুলিকে বলে প্রিয়ান। [4] সমভূমির পূর্বভাগের অপেক্ষাকৃত কম বালুময় তৃণভূমি বাগার নামে পরিচিত। এখান দিয়ে লুনি নদী প্রবাহিত হয়েছে। [5]বাগারের পূর্বাংশে আরাবল্লি থেকে আগত ছোটো ছোটো নদী তাদের দু-পাশে পলি সঞ্চয় করে যে প্লাবনভূমির সৃষ্টি করেছে, সেগুলিকে বলা হয় রোহি। [6] জয়সলমেরের কাছের সমভূমিতে কয়েকটি ছোটো-ছোটো পাহাড় দেখা যায়।[7] থর মরুভূমির নীচু অংশে এবং জয়সলমের শহরে কয়েকটি লবণাক্ত জলের হ্রদ দেখা যায়। এখানকার সম্বর হ্রদ হল সমগ্র রাজস্থান সমভূমির বৃহত্তম হ্রদ।[8] যেসব স্থানে ভৌমজলস্তর ভূপষ্ঠের কাছাকাছি থাকে, সেখানে কিছু পরিমাণ খেজুর, পামজাতীয় গাছ ও তৃণ জন্মায়। এইসব স্থানকে মরূদ্যান বলে।
2.পাঞ্জাব বা শতদ্রু সমভূমি: ① রাজস্থান সমভূমির উত্তর-পূর্বে এবং যমুনা নদীর পশ্চিমে যে বিস্তৃত সমতল এলাকা আছে, তাকে বলা হয় পাঞ্জাব সমভূমি। এই সমভূমি পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও দিল্লির অন্তর্গত। ② সিন্ধুর উপনদী শতদ্রু, বিপাশা, ইরাবতী ও চন্দ্রভাগা পলি সঞ্চয় করে এই উর্বর সমভূমিটি তৈরি করেছে। ③ সমগ্র সমভূমিটির গড় উচ্চতা প্রায় 200-240 মি। ④ এই সমভূমির দক্ষিণ, উত্তর ও উত্তর-পূর্বাংশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে কিছু পাহাড়ি ভূমি আছে।
3. গঙ্গা সমভূমি: [1] গঙ্গা সমভূমি উত্তরপ্রদেশ, বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে বিস্তৃত। পশ্চিমে যমুনা নদী থেকে শুরু করে পূর্বে গঙ্গা বদ্বীপ পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এই সমতলভূমিটি গঙ্গা এবং তার বিভিন্ন উপনদী ও শাখানদীর পলি সঞ্চয়ের দ্বারা সৃষ্ট হয়েছে।[2] এই সমভূমির নদীতীরবর্তী কোনো কোনো এলাকায় প্লাবনভূমি, স্বাভাবিক বাঁধ, অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ প্রভৃতি দেখা যায়।[3] সমগ্র এলাকাটি পশ্চিম থেকে পূর্বে বা দক্ষিণ-পূর্বে ঢালু। [4]এখানকার নতুন পলিগঠিত এলাকাসমূহকে বলা হয় খাদার এবং পুরোনো পলিগঠিত এলাকাগুলিকে বলা হয় ভাঙ্গার। [5] সমভূমির উত্তর প্রান্তে হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত নুড়ি ও বালিপূর্ণ সচ্ছিদ্র সংকীর্ণ অংশকে বলা হয় ভাবর।[6] ভাবরের দক্ষিণে জলাভূমিপূর্ণ, বন্যাপ্রবণ এবং জঙ্গলে ঢাকা যে সমতল ক্ষেত্রটি আছে তার নাম তরাইভূমি।[7] গঙ্গা সমভূমির দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে বঙ্গোপসাগর-সংলগ্ন এলাকায় গঙ্গা বদ্বীপ গড়ে উঠেছে। [৪] গঙ্গা সমভূমিকে তিনভাগে ভাগ করা যায়-[i] উচ্চ-গঙ্গা সমভূমি (গঙ্গা সমভূমির উত্তরপ্রদেশের অংশ), [ii] মধ্য-গঙ্গা সমভূমি (উত্তরপ্রদেশের পূর্বাংশ এবং বিহারের উত্তরাংশের সমভূমি) এবং [iii] নিম্ন-গঙ্গা সমভূমি (উত্তরবঙ্গের পার্বত্য ভূমি এবং পুরুলিয়া জেলার মালভূমি বাদ দিয়ে সমগ্র পশ্চিমবঙ্গ)।

4. অসম বা ব্রহ্মপুত্র সমভূমি: ① অসম রাজ্যে ব্রহ্মপুত্র নদের দু-পাশে যে সংকীর্ণ সমতলক্ষেত্রটি আছে, তার নাম ব্রহ্মপুত্র সমভূমি। ② সমভূমিটি প্রায় 1000 কিমি দীর্ঘ এবং 80-100 কিমি প্রশস্ত।③ সমভূমিটি পূর্ব থেকে পশ্চিমে ঢালু এবং এর ওপর দিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদ বিনুনির মতো এঁকেবেঁকে প্রবাহিত হয়েছে। ④ এখানে ব্রহ্মপুত্রের গতিপথে অসংখ্য বালুচর বা দ্বীপ গঠিত হয়েছে। এগুলির মধ্যে মাজুলি দ্বীপটি ভারতের বৃহত্তম নদীদ্বীপ।