পৃথিবীব্যাপী জলবায়ুর পরিবর্তন কীভাবে লোহাচড়া, ঘোড়ামারা ও নিউমুর দ্বীপ-সহ সমগ্র সুন্দরবন অঞ্চলকে প্রভাবিত করেছে তা এবং এই দ্বীপগুলির বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে আলোচনা করো।

উত্তর [ লোহাচড়া, ঘোড়ামারা ও নিউমুর দ্বীপ-সহ সমগ্র সুন্দরবন অঞ্চলের ওপর পৃথিবীব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব: সুন্দরবন অঞ্চলটি হল গঙ্গা বদ্বীপের সক্রিয় অংশ। অসংখ্য দ্বীপের সমন্বয়ে গঠিত এই অঞ্চলে গড়ে উঠেছে পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনভূমি। যেহেতু এই অঞ্চলের দক্ষিণ সীমায় আছে বঙ্গোপসাগর, তাই বর্তমানে বিশ্ব উন্নায়ন তথা জলবায় পরিবর্তনের জন্য সমুদ্র জলের উয়তা ও উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় এখানকার দ্বীপগুলিতে তার অত্যন্ত ক্ষতিকর প্রভাব পড়েছে।

1. জলতল বৃদ্ধি ও দ্বীপসমূহের অবলুপ্তি: জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সুন্দরবনসংলগ্ন সমুদ্র জলতলের উচ্চতা বিগত কয়েক বছর ধরে গড়ে বার্ষিক প্রায় 5 মিলিমিটার হারে বেড়ে চলেছে। এর ফলে একদিকে যেমন জলস্রোতের ক্ষয়ক্ষমতা যথেষ্ট বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং সেজন্য সামগ্রিকভাবে সুন্দরবন অঞ্চলে ভূমিক্ষয় বৃদ্ধি পেয়েছে, অন্যদিকে তেমন এখানকার লোহাচড়া, ঘোড়ামারা, নিউমুর-সহ বহু দ্বীপ ধীরে ধীরে জলমগ্ন হয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে।

2. ‘ক্লাইমেট রিফিউজি’ মানুষের সংখ্যাবৃদ্ধি: জনবসতি সমৃদ্ধ বহু গ্রাম তথা দ্বীপ ধীরে ধীরে জলের নীচে হারিয়ে যাওয়ার কারণে ওইসব দ্বীপের হাজার হাজার অধিবাসী উদ্বাস্তু হয়ে সুন্দরবনের অন্যান্য অংশে বা মূল ভূখণ্ডে সরে গেছে। এইভাবে ক্লাইমেট রিফিউজি মানুষের সংখ্যা ক্রমশই বেড়ে চলেছে।

3. ঘূর্ণিঝড়ের প্রকোপ বৃদ্ধি: সমুদ্র জলের উন্নতা বেড়ে যাওয়ার কারণে এই অঞ্চলে ঝড়ঝঞ্ঝা ও ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা এবং তীব্রতা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে।

4. ম্যানগ্রোভ বনভূমির ক্ষতি: বিভিন্ন দ্বীপের অবলুপ্তি, ভূমিক্ষয়, ঝড়ঝঞ্ঝা প্রভৃতি কারণে এখানকার মহামূল্যবান ম্যানগ্রোভ বনভূমির অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে চলেছে।

5. সমুদ্রজলের লকাতা বৃদ্ধি: বিশ্ব উয়ায়নের প্রভাবে সমুদ্রজলের উচ্চতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লবণতাও বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা এখানকার সমগ্র জীবকূলের কাছে বড়ো সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে।

6. বন্যার প্রকোপ বৃদ্ধি: জলতলের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ার জন্য জোয়ারের সময় নদীবাঁধ ভেঙে বন্যার প্রকোপও বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে লবণাক্ত জল প্রবেশ করে বহু উর্বর কৃষিজমি চাষের অযোগ্য হয়ে যাচ্ছে এবং জলঘটিত রোগব্যাধির প্রকোপও বেড়েছে।

লোহাচড়া, ঘোড়ামারা ও নিউমুর দ্বীপের বর্তমান পরিস্থিতি

লোহাচড়া দ্বীপ: হুগলি নদীর মোহানায় অবস্থিত এই দ্বীপটি 1980-এর দশকে সম্পূর্ণ জলের তলায় চলে যায়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে উপগ্রহচিত্রে দেখা যায় দ্বীপটি জলের ওপর সামান্য জেগে উঠেছে (পলি সঞ্চয়ের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায়)।

ঘোড়ামারা দ্বীপ: হুগলি নদীর মোহানায় সাগরদ্বীপের উত্তরে অবস্থিত এই দ্বীপটির খাসিমারা, লক্ষ্মীনারায়ণপুর প্রভৃতি জনবহুল গ্রাম ইতিমধ্যেই জলমগ্ন হয়েছে। হাটখোলা, মলোহাচড়া দ্বীপ: হুগলি নদীর মোহানায় অবস্থিত এই দ্বীপটি 1980-এর দশকে সম্পূর্ণ জলের তলায় চলে যায়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে উপগ্রহচিত্রে দেখা যায় দ্বীপটি জলের ওপর সামান্য জেগে উঠেছে (পলি সঞ্চয়ের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায়)।

নিউমুর দ্বীপ: 1970-এর দশকের প্রথম ভাগে ভারত-বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সীমানা বরাবর হাড়িয়াভাঙা নদীর মোহানা থেকে 2 কিমি দূরে এই দ্বীপটি সমুদ্র থেকে জেগে উঠলেও 2010 সালের পর থেকে এই দ্বীপটির আর কোনো চিহ্ন পাওয়া যায় না, অর্থাৎ এটিও জলমগ্ন হয়েছে। বিশ্ব উন্নায়ন তথা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে একদিকে সুন্দরবন অঞ্চলের প্রাকৃতিক ও আর্থসামাজিক পরিবেশের অবনতি ঘটায় এবং অন্যদিকে একের পর এক দ্বীপ নিশ্চিহ্ন হতে থাকায় সমগ্র অঞ্চলটিরই অস্তিত্বের সংকট দেখা দিয়েছে।

Leave a Comment