নদীর ক্ষয়কার্যের ফলে সৃষ্ট ভূমিরূপগুলির বর্ণনা করো।

উত্তর নদীর ক্ষয়কার্যের ফলে সৃষ্ট ভূমিরূণসমূহ: উৎস থেকে মোহানা পর্যন্ত নদী তার গতিপথে তিনটি কাজ করে-ক্ষয়, বহন এবং সঞ্চয়। এগুলির মধ্যে নদীর ক্ষয়কার্যের ফলে যেসব ভূমিরূপ গঠিত হয় সেগুলি হল-

1. ‘I’-আকৃতির উপত্যকা বা ক্যানিয়ন: ধারণা ও উৎপত্তি: শুষ্ক ওপ্রায়-শুষ্ক পার্বত্য অঞ্চলে নদীর ক্ষয়কার্যের ফলে ‘I’-আকৃতির নদী উপত্যকা বা ক্যানিয়নের সৃষ্টি হয়। কারণ, বৃষ্টিপাতের স্বল্পতার জন্য নদী উপত্যকাগুলির পার্শ্বদেশের বিস্তার কম, কিন্তু ভূমির ঢাল বেশি হওয়ায় নদীগুলির নিম্নক্ষয় বেশি হয়। এজন্য নদী উপত্যকা সংকীর্ণ ও গভীর হয়ে ইংরেজি ‘I’ অক্ষরের মতো দেখতে হয়। শুষ্ক ও প্রায়-শুষ্ক পার্বত্য অঞ্চলে সংকীর্ণ ও গভীর ‘1’-আকৃতির উপত্যকাকে ক্যানিয়ন বলা হয়। বৈশিষ্ট্য:① শুষ্ক বা প্রায় শুষ্ক জলবায়ু। ② কেবল নিম্নক্ষয় ঘটে এবং ‘I’ আকৃতিবিশিষ্ট হয়। উদাহরণ: কলোরাডো নদীর গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন (গভীরতা প্রায় 1857 মি)।

2. ‘V’-আকৃতির উপত্যকা বা গিরিখাত: ধারণা ও উৎপত্তি: আর্দ্র ওআর্দ্রপ্রায় অঞ্চলে নদীর উচ্চ বা পার্বত্য প্রবাহে ভূমির ঢাল বেশি থাকায় নদীগুলি প্রবলভাবে নিম্নক্ষয় করে। এরূপ নিম্নক্ষয়ের কারণে নদী

উপত্যকাগুলি যেমন সংকীর্ণ ও গভীর হয়ে ওঠে তেমনই উপত্যকার উভয় দিক থেকে নামা জল, আবহবিকার, পুঞ্জিতক্ষয় ইত্যাদির প্রভাবে কিছু পরিমাণ পার্শ্বক্ষয়ও চলে। ফলে নদী উপত্যকা ইংরেজি ‘V’ অক্ষরের মতো আকৃতি ধারণ করে। অতিগভীর ‘V’-আকৃতির এই উপত্যকাকে বলা হয় গিরিখাত। বৈশিষ্ট্য: ① আর্দ্র জলবায়ু অঞ্চলে গিরিখাত সৃষ্টি হয়। ② নিম্নক্ষয় বেশি এবং পার্শ্বক্ষয় কম হওয়ার ফলে সংকীর্ণ ‘V’ আকৃতি ধারণ করে। উদাহরণ: নেপালের কালী নদীর গিরিখাত।

3. জলপ্রপাত: ধারণা ও উৎপত্তি: নদীর জলপ্রবাহ যখন হঠাৎ কোনোউচ্চ স্থান থেকে নীচের দিকে লাফিয়ে পড়ে, তখন তাকে জলপ্রপাত বলে। নদীর গতিপথে কঠিন ও কোমল শিলাস্তর ওপরে নীচে আড়াআড়িভাবে বা অনুভূমিকভাবে অবস্থান করলে, প্রবল স্রোতে ওপরের কঠিন শিলাস্তর ধীরে ধীরে ক্ষয় হওয়ার ফলে নীচের কোমল শিলাস্তর উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। কোমল শিলাস্তর দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হয় বলে সেখানে খাড়া ঢালের সৃষ্টি হয় এবং নদীস্রোত খাড়া ঢাল থেকে প্রবল বেগে নীচে আছড়ে পড়ে জলপ্রপাতের সৃষ্টি করে। শ্রেণিবিভাগ: [i] র‍্যাপিড (খরস্রোত): জলপ্রপাতের ঢাল কম হলে তাকে র‍্যাপিড বা খরস্রোত বলে। যেমন-ছত্তিশগড়ের তিরথগড় জলপ্রপাত। [ii] কাসকেড: যখন কোনো জলপ্রপাতের জল অজস্র ধারায় বা সিঁড়ির মতো ঢাল বেয়ে ধাপে ধাপে নীচের দিকে নামে, তখন তাকে কাসকেড বলা হয়। যেমন- সুবর্ণরেখার জোনহা। [iii] ক্যাটারাক্ট: জলপ্রপাত যখন প্রবলবেগে, ভয়ংকরভাবে ফুলেফেঁপে উত্তাল জলরাশি নিয়ে গহ্বরে ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন তাকে ক্যাটারাক্ট বলা হয়। যেমন-অ্যাঞ্জেল জলপ্রপাত। উদাহরণ: ভেনেজুয়েলার ক্যারোনি (Caroni) নদীর উপনদী চুরান (Churun) নদীর গতিপথে সৃষ্ট অ্যাঞ্জেল প্রপাতটি পৃথিবীর উচ্চতম জলপ্রপাত।

4. প্রপাতকূপ বা প্রাঞ্জপুল: ধারণা ও উৎপত্তি: জলপ্রপাতের নীচেরঅংশে জলের গতিবেগ ও শক্তি খুব বেশি থাকে। এজন্য জল যেখানে নীচে পড়ে, নদীখাতের সেই অংশে জল ও পাথরখণ্ডের আঘাতে এবং নদীর ক্ষয়কার্যের ফলে বেশ বড়ো বড়ো গর্ত সৃষ্টি হয়। হাঁড়ির মতো দেখতে সেই গর্তকে বলে প্রপাতকূপ বা প্লাঞ্চপুল। উদাহরণ: মধ্যপ্রদেশের পাঁচমারিতে লিট্ল ফল জলপ্রপাতের নীচে প্রপাতকূপ আছে।

5. মন্থকূপ বা পটহোল: ধারণা ও উৎপত্তি: উচ্চগতি বা পার্বত্য প্রবাহেনদীর প্রবল স্রোতের সঙ্গে বাহিত প্রস্তরখণ্ড, নুড়ি প্রভৃতি ঘুরতে ঘুরতে নদীর তলদেশ দিয়ে অগ্রসর হয়। এর ফলে পরিবাহিত নুড়ি ও প্রস্তরখণ্ডের দ্বারা ঘর্ষণজনিত ক্ষয়ের কারণে নদীখাতে কূপের মতো অনেক গর্তের সৃষ্টি হয়। এগুলিকে বলা হয় মন্থকূপ বা পটহোল।উদাহরণ: তিস্তা নদীর পার্বত্য প্রবাহে অনেক মন্থকূপ দেখা যায়।

6 . শৃঙ্খলিত শৈলশিরা: ধারণা ও উৎপত্তি: পার্বত্য অঞ্চলে কঠিনশিলাগঠিত শৈলশিরাসমূহ নদীর গতিপথে অনেকসময় এমন বাধার সৃষ্টি করে যে, সেই বাধা এড়াতে নদী শৈলশিরাগুলির পাদদেশ ক্ষয় করে এঁকেবেঁকে প্রবাহিত হয়। তখন পরপর অবস্থিত ওই শৈলশিরাগুলিকে দূর থেকে শৃঙ্খলিত বা আবদ্ধ দেখায়। ফলে দূর থেকে দেখলে মনে হয় নদী ওই শৈলশিরাগুলির মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেছে। ওই শৈলশিরাগুলিকেই শৃঙ্খলিত শৈলশিরা বলে। উদাহরণ: পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং হিমালয়ে শৃঙ্খলিত শৈলশিরা দেখা যায়।

Leave a Comment