অথবা, অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের সময়কালে ভারতের কৃষক আন্দোলনের বিবরণ দাও।
অহিংস অসহযোগ আন্দোলন পর্বে কৃষক আন্দোলন:-
ভূমিকা:- ১৯২০-১৯২২ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ ব্রিটিশ সরকারের অপশাসনের বিরুদ্ধে গান্ধিজির নেতৃত্বে অহিংস অসহযোগ আন্দোলন চলে। এই সময় ভারতের বিভিন্ন স্থানে কৃষক আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে যা অসহযোগ আন্দোলনে শক্তি জোগায়।
[1] বাংলা:- অসহযোগ আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্র বাংলার মেদিনীপুর জেলার বিশিষ্ট কংগ্রেস নেতা বীরেন্দ্রনাথ শাসমল কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার এবং খাজনা বন্ধের ডাক দেন। এই ডাকে সাড়া দিয়ে অগণিত কৃষক ব্রিটিশ দমননীতি উপেক্ষা করে অসহযোগ আন্দোলনে শামিল হয়। এ ছাড়া বাংলার পাবনা, রংপুর, কুমিল্লা, দক্ষিণ দিনাজপুর, বীরভূম প্রভৃতি স্থানেও কৃষক আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে।
[2] বিহার:- বিহারের কৃষকদের মধ্যেও অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের প্রভাব পড়ে। সেখানকার জমিদার শ্রেণি কৃষকদের ওপর খাজনা বৃদ্ধি করে এবং খাজনা প্রদানে অক্ষম ব্যক্তির ওপর চরম অত্যাচার চালায়। এর প্রতিবাদে বিহারের কৃষক শ্রেণি ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন শুরু করে। এই আন্দোলন বিহারের মুঙ্গের, পূর্নিয়া, ভাগলপুর প্রভৃতি স্থানে ছড়িয়ে পড়ে।
[3 ] রাজস্থান:- অসহযোগ আন্দোলনের যুগে পশ্চিম ভারতের রাজস্থানে কৃষকবিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। এই অঞ্চলে বিজয় সিং পথিক ও মানিক লাল ভার্মার নেতৃত্বে সংঘটিত বিজোরিয়াতে সামন্ততন্ত্র বিরোধী কৃষকবিদ্রোহ উল্লেখযোগ্য। এই আন্দোলনে কৃষকদের প্রধান দাবি ছিল জমির ওপর কৃষকদের পূর্ণ অধিকার প্রদান করা।
[ 4] যুক্তপ্রদেশ:- অসহযোগ আন্দোলন পর্বে কৃষকবিদ্রোহের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল যুক্তপ্রদেশ। ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে মদনমোহন মালব্য যুক্তপ্রদেশের এলাহাবাদে কিষান সভা গঠন করে। এই সভার প্রধান কর্মসূচি ছিল-[i] কৃষক ও জমিদারদের মধ্যে সুসম্পর্ক স্থাপন করা, [ii] শাসক ও শাসিতের মধ্যে সুসম্পর্ক স্থাপন করা, [iii] কৃষকদের স্বার্থ সম্পর্কিত আইন প্রণয়ন করা। যুক্তপ্রদেশের এলাহাবাদ, প্রতাপগড়, রায়বেরিলি, ফৈজাবাদ, অযোধ্যা প্রভৃতি স্থানে কৃষকবিদ্রোহ সংঘটিত হয়। এর মধ্যে অযোধ্যার বরদৈ তালুকে মাদারি পাসির নেতৃত্বে সংঘটিত এক আন্দোলন (১৯২১-২২ খ্রি.) ছিল বিশেষ উল্লেখযোগ্য।
[ 5] অন্ধ্রপ্রদেশ:- অসহযোগ আন্দোলনের কালে দক্ষিণ ভারতে অন্ধ্রপ্রদেশের গুন্টুর জেলায় ব্যাপক কৃষকবিদ্রোহ সংঘটিত হয়। ১৯২১ খ্রিস্টাব্দের শেষ থেকে ১৯২২ খ্রিস্টাব্দের শুরু পর্যন্ত এখানকার কৃষকরা সরকারকে খাজনা বন্ধের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হয়। এরপর ১৯২২ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট থেকে ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দের মে পর্যন্ত আধা-উপজাতি রাম্পা কৃষকরা আন্দোলন করে। এই বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেয় সীতারাম রাজু।
[6] গুজরাট :- অসহযোগ আন্দোলনের সময় গুজরাটের সুরাট জেলার বারদৌলি তালুকে বিশিষ্ট গান্ধিবাদী নেতা বল্লভভাই প্যাটেল খাজনা বন্ধের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন যা বারদৌলি সত্যাগ্রহ (১৯২৮ খ্রি.) নামে পরিচিত। আন্দোলনে কৃষকরা তাৎক্ষণিক সাফল্যও পায়। সেখানকার আন্দোলনকারী মহিলারা বল্লভভাই প্যাটেলকে ‘সর্দার’ উপাধিতে ভূষিত করেন।
[7] কেরল:- কেরলের মালাবার উপকূলের মুসলিম কৃষকদের মোপলা বলা হত। এই অঞ্চলে রাজস্বের হার খুবই বেশি ছিল। সেইসঙ্গে এখানকার জেনমি বা জমিদারেরা মুসলিম কৃষকদের ওপর ব্যাপক শোষণ-অত্যাচার চালাত। এর প্রতিবাদে মোপলা কৃষকরা স্থানীয় জমিদারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। অবশ্য এই বিদ্রোহে অনেকে সাম্প্রদায়িকতার আভাস পেয়েছেন।
উপসংহার:- অসহযোগ আন্দোলনের সময় ভারতের কৃষকরা গান্ধিজির আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে আন্দোলনে যোগ দেয়। ফলে ভারতের নানা প্রান্তে কৃষক বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। কিছু মানুষ গান্ধিজিকে দেবতা রূপে পুজো করতে শুরু করে। তাদের বিশ্বাস ছিল যে, গ্রামের অত্যাচারী জমিদার ও মহাজন শ্রেণির মানুষের হাত থেকে গান্ধিজি তাদের রক্ষা করবে।
ক্লিক করুন দশম শ্রেণির ইতিহাস এর সমস্ত অধ্যায় অনুযায়ী তার সব প্রশ্নের উত্তর