বিশ্ব উন্নায়নের প্রভাবগুলি আলোচনা করো।

বিশ্ব উয়ায়নের প্রভাব: মানুষের বিভিন্ন প্রকার অবিবেচনাপ্রসূত ক্রিয়াকলাপের কারণে পৃথিবীর স্বাভাবিক উয়তা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই ক্রমবর্ধমান ও অস্বাভাবিক উন্নতা বৃদ্ধিকেই বলে বিশ্ব উন্নায়ন বা গ্লোবাল ওয়ার্মিং। এর উল্লেখযোগ্য প্রভাবগুলি হল-

1. জলবায়ু পরিবর্তন: পৃথিবীর উয়তা ক্রমশ বেড়ে যাওয়ার জন্য শীতের তুলনায় গ্রীষ্মের তীব্রতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, প্রায় প্রতিটি ঋতুর আগমন অনিয়মিত ও বিলম্বিত হচ্ছে, ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা ও তীব্রতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং খরার প্রাদুর্ভাব বাড়ছে।

2. হিমবাহের মাত্রাতিরিক্ত গলন: ভূমণ্ডলের উন্নতা বেড়ে যাওয়ার জন্য অ্যান্টার্কটিকা ও গ্রিনল্যান্ডের অসংখ্য হিমবাহ ও বিশালাকৃতি বরফের চাদর (ice sheet) সহ পৃথিবীর বিভিন্ন পার্বত্য হিমবাহ গলে যাওয়ার জন্য ক্রমশই সংকুচিত হচ্ছে অর্থাৎ এদের আয়তন হ্রাস পাচ্ছে। যেমন-হিমালয়ের গঙ্গোত্রী, যমুনোত্রী প্রভৃতি হিমবাহ।

3. নদনদীতে জলের পরিমাণ হ্রাস: পার্বত্য হিমবাহগুলি ক্রমশ সংকুচিত হওয়ার ফলে হিমবাহসৃষ্ট নদনদীতে জলের পরিমাণ ক্রমশ কমে আসছে। এর ফলে গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, সিন্ধু প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ নদনদী ধীরে ধীরে ক্ষীণকায় হতে থাকবে এবং তার ফলে ভারত, চিন,  পাকিস্তান, বাংলাদেশ সহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে জলাভাবজনিত নানা ধরনের সমস্যা ভয়ংকর রূপ নেবে।

4. সমুদ্র জলতলের উচ্চতা বৃদ্ধি: মেরু অঞ্চল এবং পার্বত্য অঞ্চলের হিমবাহ দ্রুত গলে যাওয়ার জন্য সমুদ্রের জলতলের উচ্চতা বেড়ে যাচ্ছে। বিগত শতাব্দীতে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা 0.9°সে বৃদ্ধির জন্য সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রায় 10-12 সেমি বেড়ে গেছে। এজন্য সমুদ্র উপকূলের নীচু অংশগুলি জলমগ্ন হওয়ার আশঙ্কা আছে।

5. অধঃক্ষেপণের প্রকৃতি পরিবর্তন: বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে বাষ্পীভবনের হার ও বায়ুর জলীয় বাষ্প ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। বৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি, তুষারপাত ইত্যাদির তীব্রতা বেড়েছে। অধঃক্ষেপণের বণ্টনে যথেষ্ট অস্বাভাবিকতা সৃষ্টি হয়েছে, অর্থাৎ শুষ্ক অঞ্চলগুলিতে বন্যা এবং আর্দ্র অঞ্চলগুলিতে খরা দেখা দিচ্ছে।

অন্যান্য প্রভাব

1. শস্য উৎপাদনের হ্রাসবৃদ্ধি: কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে উন্নতা বৃদ্ধি ও খরাজনিত কারণে প্রধান খাদ্যশস্যগুলির উৎপাদন 10 থেকে 70 শতাংশ পর্যন্ত কমে যাবে।

2. কৃষি পদ্ধতির পরিবর্তন: বৃষ্টিপাতনির্ভর কৃষি এলাকাগুলিতে সেচব্যবস্থানির্ভর চাষবাস শুরু হবে। উচ্চ অক্ষাংশে উন্নমণ্ডলের ফসল চাষ বৃদ্ধি পাবে বলে কৃষিচক্রের পরিবর্তন ঘটবে।

3. এল নিনোর আগমন ও প্রভাব বৃদ্ধি: ① কোনো কোনো বছর বড়োদিনের কাছাকাছি সময়ে দক্ষিণ আমেরিকার পেরুর প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলে যে দক্ষিণমুখী উয় স্রোতটি প্রবাহিত হয়, তাকে এল নিনো বলে। এল নিনোর আর্বিভাবের বছরগুলিতে ভারত-সহ দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ায় খরা, পেরু-চিলির মরুভূমিতে অত্যধিক বৃষ্টিপাত, কানাডায় উয়-শীতল বায়ুপ্রবাহ প্রভৃতি বিভিন্ন ধরনের অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটে। অর্থাৎ বিশ্ব জলবায়ুতে একটা অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে বিশ্ব উন্নায়নের জন্য এল নিনোর আগমন ও তীব্রতা ক্রমশই বৃদ্ধি পাবে।

Leave a Comment