লোন নেওয়ার আগে কি কি জানা দরকার

লোন নেওয়ার আগে কি কি জানা দরকার, দেখে নিন বিস্তারিতভাবে

বিভিন্ন জরুরি কারণে হঠাৎ করে অনেকটা পরিমাণ টাকার প্রয়োজন পড়লে বা ব্যবসায়ে বিনিয়োগের জন্য, সাধারণ মানুষ ঋণ নেওয়ার কথা বিবেচনা করেন। নানান ফাইন্যান্স সংস্থা ও ব্যাংক বিভিন্নরকম সুদের হারে গ্রাহকদের লোন দিয়ে থাকে। তবে ঋণ নেওয়ার আগে সঠিক তথ্য ও শর্তাবলীগুলি না জেনে অগ্রসর হলে, ঝুঁকি ও আর্থিক ঝামেলার মুখে পড়তে হয়। ভারতে পার্সোনাল লোন, কার লোন, হোম লোন, এডুকেশন লোন প্রভৃতি জনপ্রিয়। কিন্তু ঋণ নেওয়ার আগে মাসিক কিস্তির পরিমাণ, সুদের হার ও অন্যান্য ঝুঁকিগুলি সম্পর্কে না জানলে ক্রেডিট স্কোর খারাপ হতে পারে, যা পরবর্তীকালে লোন নেওয়ার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এমনকি অনেক সময় ঋণ গ্রহীতার দেউলিয়া হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। তাই লোন নেওয়ার আগে আয়, খরচ ও ঋণ পরিশোধের ক্ষমতা মূল্যায়ন করার বিশেষভাবে আবশ্যক। 

কত ধরনের ঋণ হয়?

ঋণদানকারী সংস্থা ও ব্যাংক গ্রাহকের প্রয়োজনের ওপর ভিত্তি করে ঋণ দিয়ে থাকে। 

সিকিওরড লোন: জামানত অর্থাৎ নিজস্ব বাড়ি, জমি, সোনা বা অন্যান্য সম্পদ বন্দক দিয়ে এই লোন নেওয়া হয়। এর ক্ষেত্রে সুদের হার কম থাকে (৭-১০% এর মধ্যে)। যেমন – হোম লোন বা গোল্ড লোন। 

আনসিকিওরড লোন: এই লোনে কোনো জামানত থাকে না, শুধু আয়ের প্রমাণপত্র প্রয়োজন হয়। ফলে এতে সুদ বেশি হয়ে থাকে (১০-২৫% এর মধ্যে)। যেমন – পার্সোনাল লোন বা এডুকেশন লোন। এছাড়াও রয়েছে বিজনেস লোন, অটো লোন। প্রয়োজনের সাথে মিলিয়ে ঋণের ধরন নির্বাচন করলে খরচ অনেকটাই কম হয়। 

সুদের হার ও অন্যান্য চার্জ কত থাকে?

ঋণ নেওয়ার আগে সুদের হার কত, তা জেনে সিদ্ধান্ত নেওয়া খুবই প্রয়োজন। কারণ আসলের সাথে সুদ মিলিয়েই প্রতি মাসে ইএমআই (EM)-এর পরিমাণ ধার্য করা হয়। তাই গ্রাহককে তার নিজস্ব ক্ষমতা বুঝে লোন নেওয়া উচিত। পাশাপাশি লোন প্রসেসিং, দেরিতে বা সময়ের আগে ঋণ মিটিয়ে দেওয়ার জন্যও কিছু চার্জ রয়েছে।  

সুদের ধরন: সুদ ফিক্সড (স্থির) বা ফ্লোটিং হতে পারে। ফ্লোটিং রেট বাজারের ওপর নির্ভরশীল, তা আরবিআই (Reserve Bank of India) রেপো রেটের সাথে পরিবর্তন হয়। বর্তমানে কমপক্ষে ৭.২-৮% সুদের হারে হোম লোন  ও ১০-২০% সুদে পার্সোনাল লোন পাওয়া যায়। 

অতিরিক্ত চার্জ: ব্যাংক বা ফাইন্যান্স সংস্থাগুলি লোন প্রসেসিংয়ের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ ফি নিয়ে থাকে, যা সাধারণত লোনের ০.৩৫-২% হয়। এছাড়াও রয়েছে লেট ইএমআই ফি (১৫০-৫০০ টাকা + জিএসটি), বাউন্স চার্জ ( প্রায় ৫০০ টাকা)। আবার ধার্য সময়ের আগেই যদি কোনো ঋণ গ্রহীতা লোন পরিশোধ করে দিতে চান, তাকে প্রি-পেমেন্ট চার্জ দিতে হয়। যদি ৬ মাসের আগে পরিশোধ করেন, তবে এর পরিমাণ লোন অ্যামাউন্টের ২ থেকে ৪% এর মধ্যে থাকে। ঋণের চুক্তিপত্রে এই সমস্ত চার্জগুলি সম্পর্কে স্পষ্টভাবে লেখা থাকে, তাই আগেই এগুলি দেখে নেওয়া প্রয়োজন। 

ঋণ পাওয়ার জন্য যোগ্যতার মানদণ্ডগুলি কি কি?

লোন পেতে গেলে গ্রাহকের প্রোফাইল শক্তিশালী শক্তিশালী হওয়া আবশ্যক। এর কয়েকটি মাপকাঠি রয়েছে। 

ক্রেডিট স্কোর: সিবিল (CIBIL) স্কোর ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে অন্যতম মানদণ্ড। কোনো ঋণ গ্রহীতার এই স্কোর ৭৫০-এর বেশি থাকলে তিনি সহজে, দ্রুত ও কম সুদেই লোন পেতে পারেন। কিন্তু আবার, স্কোর ৬০০-এর নীচে থাকলে লোন স্যাংকশন হওয়া প্রায় অসম্ভব। এই স্কোর বাড়াতে ক্রেডিট কার্ডের বিল সময়মতো দেওয়া এবং এমআই মিস না করে ঠিকমতো পরিশোধ করা প্রয়োজন।

আয়ের প্রমাণ: চাকুরীজীবী ব্যক্তিদের স্যালারি স্লিপ ও সেল্ফ-এমপ্লয়ড/ ব্যবসায়ীদের ২ বছরের ইনকাম ট্যাক্স রিটার্ন ও আয়ের অন্যান্য প্রমাণপত্রগুলি দেখিয়ে লোন নিতে হয়। ইএমআই-এর পরিমাণ তার আয়ের ৫০-৬০%-এর কম হতে হবে।

বয়স ও কর্মজীবনের সময়সীমা: ভারতবর্ষে সাধারণত ২১ থেকে ৬০ বছরের ব্যক্তিদের লোন দেওয়া হয়। তাদের কমপক্ষে ১-২ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা বা ৩ বছরের ব্যবসা থাকা প্রয়োজন। বিভিন্ন ব্যাংক মহিলাদের জন্য কম সুদে বিশেষ স্কিম অফার করে থাকে।

প্রয়োজনীয় কাগজপত্র: ঋণ পেতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হিসেবে দিতে হয় ব্যক্তিগত পরিচয়পত্র, যেমন – আধার কার্ড, প্যান কার্ড, ভোটার আইডি/পাসপোর্ট। এর পাশাপাশি লাগে আয়ের প্রমাণ। বেতনভোগীদের জন্য ৩ থেকে ৬ মাসের স্যালারি স্লিপ, ফর্ম-১৬ ও ব্যাঙ্ক স্টেটমেন্ট। আর সেল্ফ-এমপ্লয়ডদের দিতে হয় ২ থেকে ৩ বছরের ইনকাম ট্যাক্স রিটার্ন ও ৬ থেকে ১২ মাসের ব্যাংক স্টেটমেন্ট। এছাড়া দরকার ঠিকানার প্রমাণপত্র, যেমন – ইউটিলিটি বিল বা ভাড়ার চুক্তি এবং পাসপোর্ট সাইজ ছবি।  সিকিওরড লোনে জামানতের ডকুমেন্ট (সম্পত্তির দলিল) লাগে। নথির প্রয়োজনীয়তা ব্যাংকভেদে ভিন্ন হয়। 

লোন আবেদন কিভাবে করতে হয়?

লোন আবেদনের প্রক্রিয়া সাধারণত সহজ এবং অনলাইন ও অফলাইন – দুভাবেই আবেদন করা যায়। ঋণ আবেদনের ধাপগুলি হল – 

প্রয়োজন ও যোগ্যতা নির্ধারণ: আবেদনকারীকে প্রথমেই ঠিক করতে হবে তার কত টাকা লাগবে এবং ইএমআই-এর পরিমাণ যেন তার আয়ের ৫০%-এর বেশি না হয়। ঋণ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরই ক্রেডিট স্কোর চেক করা আবশ্যক।  

ব্যাঙ্ক/ফাইন্যান্স সংস্থাগুলির মধ্যে তুলনা:  এসবিআই (SBI), এইচডিএফসি (HDFC)-এর মতো ব্যাংক ও বাজাজ ফিনসার্ভ (Bajaj Finserv)-এর মতো আর্থিক পরিষেবা সংস্থাগুলির সুদের হার ও বিভিন্ন চার্জগুলি তুলনা করলে সহজ ও সুবিধাজনক স্কিমটি খুঁজে নেওয়া সম্ভব হবে। প্রি-অ্যাপ্রুভড লোনগুলির বিষয়েও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

অনলাইন/অফলাইন আবেদন প্রক্রিয়া: ঘরে বসেই ব্যাঙ্কের অ্যাপ বা ওয়েবসাইটে গিয়ে সহজে লোনের জন্য আবেদন করা যায়। অ্যাপ্লাই করার পর নাম, মোবাইল নম্বর, আয়ের পরিমাণ, লোনের পরিমাণ, মেয়াদ দিয়ে ফর্ম ফিল-আপ করতে হবে। এরপর রেজিস্টার্ড মোবাইল নম্বরে আসা ওটিপি (OTP) ভেরিফাই করতে হবে।

ডকুমেন্ট আপলোড প্রক্রিয়া: আধার কার্ড, প্যান (PAN), স্যালারি স্লিপ (নূন্যতম তিন মাসের), ইনকাম ট্যাক্স রিটার্ন (সেল্ফ-এমপ্লয়েডদের ক্ষেত্রে), ব্যাঙ্ক স্টেটমেন্ট আপলোড করতে হবে। তারপর ডিজিটাল বা ই-সাইন (e-Sign) করে জমা দিতে হবে। 

ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া: ব্যাঙ্ক প্রথমে ফোন করে আয় যাচাই ও সিবিল চেক করে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আবেদনের ১ থেকে ৩ দিনের মধ্যে ব্যাংকের তরফে পাঠানো ভেরিফায়াররা তথ্য যাচাইয়ের জন্য বাড়ি ও কর্মস্থানে ভিজিট করেন। 

অনুমোদন ও লোন ডিসবার্স: সমস্ত নথি যাচাই করে ও আবেদনকারীর প্রোফাইল খতিয়ে দেখার পর সব ঠিক থাকলে ২ থেকে ৭ দিনের মধ্যে (পার্সোনাল লোনে কখনো দিনের দিন) অনুমোদনপত্র পাঠানো হয়। তারপর টাকা অ্যাকাউন্টে জমা হয়। চুক্তিপত্র সই করে সেই টাকা ঋণ গ্রহীতারা ব্যবহার করতে পারেন।

ইএমআই প্রক্রিয়া চালু: যে মাসে লোন নেওয়া হল তার পরবর্তী মাসেই বা কিছু ক্ষেত্রে একমাস বাদ রেখে তার পরের মাস থেকে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে অটো-ডেবিট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে লোন পরিশোধ শুরু হয়ে যায়। 

লোন নেওয়ার কি কি ঝুঁকি রয়েছে ?

সহজ পদ্ধতিতে খুব দ্রুত মোটা অঙ্কের টাকা ধার করা গেলেও ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু ঝুঁকি অবশ্যই রয়েছে, তাই এই ঝুঁকিগুলি না বিবেচনা করলে পরবর্তীকালে লোন পরিশোধে সমস্যা হতে পারে। ইএমআই মিস হওয়ার ৯০ দিন পর ব্যাংক সেটাকে নন পারফর্মিং অ্যাসেট (NPA) বলে গণ্য করে ফলে ঋণ গ্রহীতা ডিফল্টার হয়ে যান, তার সিবিল ৩০০-এ নেমে যায়। ব্যাংক জমা রাখা জমি, সোনা বিক্রি করতে পারে বা গ্যারেন্টারের কাছেও পাওনা দাবি করতে পারে। এর পাশাপাশি আইনি খরচও বাড়ে।

সিকিওরড লোন না মেটালে ব্যাংক জামানত বাজেয়াপ্ত করতে পারে। তাছাড়া, কোনো ব্যক্তির লোনের গ্যারেন্টর হওয়ার আগেও সব দিক বিচার করা খুবই প্রয়োজন। না হলে ঋণ গ্রহীতাকে না পেয়ে ব্যাংক গ্যারেন্টরের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, সম্পত্তি বা আয়ের ওপর দাবি করতে পারে।

সহজে লোন পরিশোধের কৌশলগুলি কি কি ?

লোন পরিশোধ যাতে সহজ হয় তার জন্য কয়েকটি কথা মাথায় রাখতে হবে। ইএমআই আয়ের ৪০% এর নীচে থাকা নিরাপদ। অটো-ডেবিট সেট করে রাখলে মাসিক কিস্তি সঠিক সময়ে ব্যাংকের কাছে পৌঁছে যায়। লোন শুরুর ১ বছর পর প্রি-পেমেন্ট করলে কোনো পেনাল্টি লাগে না, তাই অতিরিক্ত টাকা হাতে আসলে বা বোনাস দিয়ে আসলের কিছুটা শোধ করলে সুদের হার কমে। বিশেষ ক্ষেত্রে রিফাইন্যান্স অর্থাৎ কম সুদে লোন নিয়ে পুরনো পরিশোধ করাও একটি পদ্ধতি হতে পারে। পাশাপাশি জরুরি ফান্ড রাখলেও অনেকটাই সুবিধা হয়। সঠিক পরিকল্পনার সাথে ঋণ নিলে সমস্ত ঝুঁকির হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।

Leave a Comment