লোন আবেদন করার পর কতদিনে টাকা পাওয়া যায়

লোন আবেদন করার পর কতদিনে টাকা পাওয়া যায়, জেনে নিন বিশদে 

আমরা প্রায়শই বিভিন্ন কারণে অর্থের প্রয়োজন হলে ব্যাংক ও বিভিন্ন ফাইন্যান্স কোম্পানি থেকে ঋণ নিয়ে থাকি। লোনের জন্য আবেদন করার পর কত দিনে টাকা পাওয়া যায় – এই প্রশ্ন অনেকের মধ্যেই থাকে। এই সময়সীমা লোনের ধরন, ব্যাঙ্ক, আবেদনকারীর ক্রেডিট স্কোর ও প্রোফাইলের ওপর নির্ভর করে ১ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে হতে পারে। ভারতের ব্যাঙ্কগুলি (যেমন – এসবিআই, অ্যাক্সিস, এইচডিএফসি) থেকে পার্সোনাল লোন পেতে সাধারণত ২ থেকে ৭ দিন লাগে। কিন্তু আবার হোম লোনের জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে প্রায় ১৫ থেকে ৩০ দিন। লোন পাওয়ার সময়সীমার ক্ষেত্রে রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া (RBI)-এর নিয়ম অনুযায়ী স্বচ্ছতা বাড়ানো হয়েছে, তবে দেরি হল অন্যান্য ব্যবস্থাও রয়েছে। চলুন এসম্পর্কে বিস্তারিত ভাবে জেনে নেওয়া যাক। 

লোনের ধরন অনুযায়ী টাকা পাওয়ার সময়সীমা 

ব্যাংক এবং ফাইনান্স সংস্থাগুলি ঋণের ধরনের ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন সময় লোনের টাকা ডিসবার্স করে থাকে। যেমন – পার্সোনাল লোনের ক্ষেত্রে বাজাজ ফিনসার্ভ (Bajaj Finserv) ঋণ অনুমোদন করার পর ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ঋণ গ্রহীতার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠিয়ে দেয়, বিশেষ করে প্রি-অ্যাপ্রুভড হলে। আবার, এইচডিএফসি (HDFC) ব্যাংক তাদের প্রি-অ্যাপ্রুভড কাস্টমারদের ১০ সেকেন্ডে লোন ডিসবার্স করে দেয়, তবে এমনিতে ৪ দিন লাগে।আদিত্য বিড়লা (Aditya Birla)-এর মত নন-ব্যাংকিং ফাইনান্স কোম্পানিতে পার্সোনাল লোনের সময়সীমা ২৪ ঘণ্টা থেকে ৭ দিন। 

আবার হোম লোনের ক্ষেত্রে, স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া-তে আবেদন করা থেকে প্রসেসিং হওয়া পর্যন্ত ৭ থেকে ১৫ দিনের মতো সময় লাগে, ভেরিফিকেশনের জন্য আরও অতিরিক্ত ৩ থেকে ৫ দিন। গাড়ি কেনার জন্য গ্রাহককে ১ থেকে ৫ দিনের মধ্যেই লোন অ্যাপ্রুভ করে দেওয়া হয়, বিজনেস লোনে সময় লাগে ৩ থেকে ১৫ দিন। 

গোল্ড লোন নিলে সোনা জামানত রেখে ৩০ মিনিট থেকে ২ ঘণ্টার মধ্যেই টাকা পাওয়া যায়, কিন্তু পার্সোনাল লোনে কোনো সিকিউরিটি না থাকায়, তা একান্তই গ্রাহকের সিবিল (CIBIL)-এর ওপর নির্ভরশীল। বর্তমানে নানান ফিনটেক অ্যাপ্লিকেশনগুলি (যেমন – Chola One অ্যাপ) মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যেই ডিজিটাল লোন ডিসবার্স করে বলে দাবি করে।  

আবেদন থেকে লোন ডিসবার্সমেন্ট পর্যন্ত কটি ধাপ রয়েছে ?

আবেদন জমা:  অনলাইন ও অফলাইন – উভয়ভাবেই ঋণের জন্য আবেদন করা যায়। স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার অনলাইন অ্যাপ ইয়োনো (YONO) বা এইচডিএফসি ব্যাংকের অফিসিয়াল অ্যাপে কয়েক মিনিটের মধ্যেই লোন অ্যাপ্লিকেশন করা যেতে পারে। 

ডকুমেন্ট ভেরিফিকেশন: আবেদনের সময় জমা দেওয়া নথিপত্রের যাচাইকরণের জন্য ১ থেকে ২ দিন সময় লাগে। প্রধানত আধার, প্যান কার্ড, স্যালারি স্লিপ ও ব্যাঙ্ক স্টেটমেন্ট যাচাই করা হয়।

আয় এবং ক্রেডিট স্কোর যাচাই: গ্রাহকদের আয়ের প্রমাণপত্র ও ক্রেডিট স্কোর ভেরিফাই করতে ১ থেকে ৩ দিন সময় লাগে। সিবিল (CIBIL) স্কোর ৭৫০-এর বেশি থাকলে লোন দ্রুত পেতে সুবিধা হয়। বাড়ির পাশাপাশি চাকুরীজীবিদের কর্মস্থলে ও ব্যবসায়ীদের কারখানা বা দোকানে ব্যাংক থেকে ভেরিফায়ার পাঠানো হয়।

অনুমোদনপত্র: সবকিছু ঠিক থাকলে ভেরিফিকেশনের ২ থেকে ৩ দিনের মধ্যে ঋণ গ্রহীতার কাছে অনুমোদনের চিঠি পাঠায় ব্যাংক/ফাইন্যান্স কোম্পানি।

চুক্তিপত্র সই: এরপর চুক্তিপত্র সই করার প্রক্রিয়া মোটামুটি ১ দিনের মধ্যেই হয়। উল্লেখ্য, সই করার আগে চুক্তিপত্রে লেখা শর্তাবলীগুলি দেখে নেওয়া খুবই জরুরি।

ডিসবার্সমেন্ট: আগের প্রক্রিয়াগুলি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হলে ১ থেকে ২ দিনের মধ্যেই লোনের টাকা গ্রাহকের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করা হয়। ডিসবার্স হওয়ার পর ১ থেকে ৭ দিনের মধ্যে ইমেইল, এসএমএস বা পোস্টে ওয়েলকাম কিট পাঠানো হয়। এতে লোন সম্পর্কিত যাবতীয় তথ্য থাকে। লোনের টাকা ব্যাংকে আসার ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে ইএমআই (EMI) অটো-ডেবিট সেটআপ হয়, যার মাধ্যমে প্রতি মাসে নির্দিষ্ট সময় টাকা ব্যাংক একাউন্ট থেকে কাটা হয়। 

কি কি কারণে লোন পেতে দেরি হতে পারে?

জমা করা নথিপত্র অসম্পূর্ণ বা ভুল হলে রি-ভেরিফিকেশন করতে হয়, যা ৩ থেকে ৫ দিন সময় বাড়ায়। এছাড়া, ক্রেডিট স্কোর ৭৫০-এর নীচে থাকলে গ্রাহকের প্রোফাইলের অন্যান্য দিকগুলি বিবেচনা করে দেখার জন্যও অতিরিক্ত সময় লাগে। ডেট-টু-ইনকাম রেশিও, অর্থাৎ আয়ের ৫০% এর বেশি  ইএমআই-এর পরিমাণ হলে লোন পেতে দেরি হয়, আবার অনেক সময় তা প্রত্যাখ্যাতও হয়। 

চাকুরীজীবীদের ক্ষেত্রে কর্মস্থলে অস্থিতিশীলতা বা ব্যাঙ্ক স্টেটমেন্টে অসঙ্গতি দেখা গেলে ফোন করে সরাসরি ভিজিট করে পুনরায় ভেরিফিকেশনের প্রয়োজন হয়, যা সময় সাপেক্ষ। এছাড়া, ব্যাঙ্কের ব্যাকলগ বা ছুটির দিন লোন ডিসবার্স-এ দেরি করাতে পারে। গ্রাহক যদি একাধিক আবেদন করে রাখেন, সিবিল-এ তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে, এটিও দেরি হওয়ার একটি অন্যতম কারণ। 

তাড়াতাড়ি লোন পেতে কি কি পদক্ষেপ অনুসরণ করা যেতে পারে?

আধার কার্ড, প্যান (PAN) কার্ড, ৩ থেকে ৬ মাসের স্যালারি স্লিপ এবং ব্যাঙ্ক স্টেটমেন্ট-এর মতো জরুরী ডকুমেন্টগুলি আগে থেকেই প্রস্তুত রাখা লোন পাওয়ার গতি ত্বরান্বিত করতে পারে। 

ব্যাংক এবং নন ব্যাংকিং ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলি প্রি-অ্যাপ্রুভড লোনে কি কি অফার করছে, তা যাচাই করলে ঋণ দ্রুত পাওয়া যায়। আর সিবিল স্কোর ৭৫০-এর বেশি থাকলেও তাড়াতাড়ি লোন মেলে।  

অনলাইন আবেদন করা এবং ভেরিফিকেশন কলে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিয়ে, দ্রুততার সাথে লোন পাওয়া যায়। ব্যাংকে বিদ্যমান অ্যাকাউন্ট থেকে আবেদন করলে প্রায়োরিটি পাওয়া যায়।

রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার নিয়মাবলী গুলি কি কি?

আরবিআই-এর নিয়মাবলী এবং লোন নেয়ার পরবর্তী পদক্ষেপগুলি সম্পর্কে জানলে ঋণগ্রহীতারা অনেক ঝামেলায় এড়িয়ে চলতে সক্ষম হবেন। বিশেষ করে প্রি-পেমেন্ট চার্জ,  প্রসেসিং ফি, ওয়েলকাম কিট বা ইএমআই সেট সম্পর্কে আগে থেকে জেনে রাখা উচিত। আরবিআই ব্যাংক এবং নন ব্যাংকিং ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলির জন্য কয়েকটি নির্দিষ্ট নিয়মাবলী স্থির করেছে, যার ফলে লোন নেওয়ার প্রক্রিয়া এখন অনেক বেশি স্বচ্ছ ও নিরাপদ। 

আরবিআই নির্দিষ্ট করে দিয়েছে, লোন লেন্ডাররা যাতে কাস্টমারদের ইএমআই কাটার প্রক্রিয়া, প্রসেসিং ফি এবং অতিরিক্ত চার্জ কোন কোন অবস্থায় প্রয়োজন হয় – সেসম্পর্কে বিস্তারিতভাবে জানায়। 

লোন নেওয়ার সময় কি কি সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত?

লোন নেওয়ার আগে ঋণ গ্রহীতাকে সবসময় দেখে নিতে হবে লেন্ডার আরবিআই রেজিস্টার্ড কিনা। কারণ এরকম কিছু জাল কোম্পানি ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে, যারা বেআইনি পন্থা অবলম্বন করে। এর পাশাপাশি, লোন নেওয়ার আগে ইএমআই ক্যালকুলেটরে হিসাব করে নেওয়া উচিত। দেখতে হবে ইএমআই যেন আয়ের ৪০ থেকে ৫০% এর বেশি না হয়। চুক্তিপত্র ভালো করে পড়ে নেওয়া উচিত, যাতে হিডেন চার্জগুলি অজানা না থাকে। দ্রুততার জন্য ব্যাংকের নিকটস্থ শাখা বা ফাইন্যান্স সংস্থার অফিসের সাথে যোগাযোগ রাখা দরকার। একাধিক আবেদন না করাই ভালো, এতে ক্রেডিট স্কোর খারাপ হয়। ঋণ সবসময় দায়িত্বশীলভাবে নেওয়া উচিত, প্রয়োজন না থাকলে এড়িয়ে চলাই ভালো।

Leave a Comment