ভূমিকা: অষ্টাদশ শতকের শেষভাগে বাংলায় আধুনিক ছাপাখানার প্রতিষ্ঠা হয় এবং ঊনবিংশ শতকের প্রথমভাগে ছাপাখানার ব্যাপক প্রসার ঘটে। এসব ছাপাখানায় শিক্ষার্থীদের উপযোগী বহু বইপত্র ছাপা হয়ে তাদের হাতে পৌঁছে যায়। ফলে বাংলায় শিক্ষার যথেষ্ট প্রসার ঘটতে শুরু করে।
[ 1] প্রেক্ষাপট: বঙ্গদেশে আধুনিক ছাপাখানা প্রতিষ্ঠার আগে হাতেলেখা পুথিপত্রের সাহায্যে শিক্ষাগ্রহণের কাজ চলত। এই বইয়ের মূল্য খুব বেশি হত বলে এই সময় নিম্নবিত্ত দরিদ্র সমাজে শিক্ষার প্রসারের বিশেষ সুযোগ ছিল না। তাই এই সময় বাংলার শিক্ষাদান মূলত সমাজের উচ্চবিত্তদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। তা ছাড়া এই সময় শিক্ষা বলতে মূলত ছিল দীর্ঘ আরবি বা সংস্কৃত কবিতা বা শাস্ত্রের বক্তব্য মুখস্থ করা। এককথায়, ছাপা বইপত্র বাজারে আসার আগে বাংলায় শিক্ষার প্রসার ছিল খুবই সীমাবদ্ধ।
[2] ছাপা বইয়ের সহজলভ্যতা: ঊনবিংশ শতকের শুরু থেকে ছাপাখানায় ছাপা প্রচুর সংখ্যক সুদৃশ্য বইপত্র বাজারে আসতে শুরু করে। একদিকে এসব মুদ্রিত বইয়ের জোগান ছিল বিপুল, অন্যদিকে এগুলি দামেও ছিল সস্তা। ফলে দরিদ্র, সাধারণ শিক্ষার্থী ও পাঠকদের হাতে সহজেই ছাপা বইপত্র পৌঁছে যায়। বাংলার ছাপাখানাগুলি থেকে মাতৃভাষা বাংলায় ছাপা প্রচুর বইপত্র বাজারে আসতে শুরু করলে শিক্ষার্থীরা নিজের মাতৃভাষা বাংলায় শিক্ষাগ্রহণের সুযোগ পায়। ফলে বাংলায় ব্যাপক শিক্ষাবিস্তার শুরু হয়।
[3] শ্রীরামপুর ছাপাখানার অবদান: খ্রিস্টান মিশনারি উইলিয়াম কেরি ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে শ্রীরামপুরে আধুনিক ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করলে এদেশে শিক্ষার প্রসারে ভীষণ সুবিধা হয়। এশিয়ার তৎকালীন সর্ববৃহৎ এই ছাপাখানা থেকে বাংলাসহ বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায় বাইবেল, রামায়ণ, মহাভারত, বিভিন্ন প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্য প্রভৃতির অনুবাদ, হিতোপদেশ, বিভিন্ন গবেষণামূলক প্রবন্ধ, রামরাম বসুর ‘প্রতাপাদিত্য চরিত্র’ প্রভৃতি প্রকাশিত হয়। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের জন্য বিপুল সংখ্যক পাঠ্যপুস্তক এই ছাপাখানায় মুদ্রিত হয়ে শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে যায়।
[4] পাঠ্যপুস্তক সরবরাহ: ছাপাখানাগুলির মুদ্রিত বইপত্র বিনামূল্যে বা সস্তায় ছাত্রছাত্রীদের হাতে পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে ক্যালকাটা স্কুল বুক সোসাইটি (১৮১৭ খ্রি.) প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে ক্যালকাটা স্কুল সোসাইটি স্থাপিত হলে তার অধীনে বেশ কয়েকটি স্কুল গড়ে ওঠে। এইসব প্রতিষ্ঠান শিক্ষার প্রসারের উদ্দেশ্যে পাঠ্যপুস্তকের হাজার হাজার কপি শ্রীরামপুরের ছাপাখানায় ছাপায়। ফলে শহর ও গ্রামের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের যেসব সাধারণ মানুষ বিদ্যাশিক্ষা থেকে বঞ্চিত ছিল তাদের হাতে ছাপাখানায় মুদ্রিত সুন্দর ঝকঝকে পাঠ্যবই পৌঁছে যায়।
[5 ] শিশুশিক্ষার জন্য বই প্রকাশ: বাংলার শিশুদের মধ্যে শিক্ষার প্রসারের উদ্দেশ্যে ছাপাখানাগুলিতে প্রচুর সংখ্যক শিশুশিক্ষা-বিষয়ক বইপত্র ছাপা হতে থাকে। এসব মুদ্রিত বইয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল মদনমোহন তর্কালংকারের ‘শিশুশিক্ষা’, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’, রামসুন্দর বসাকের ‘বাল্যশিক্ষা’ প্রভৃতি। বিদ্যাসাগর রচিত ‘বর্ণপরিচয়’-এর তাঁর জীবদ্দশাতেই মোট ১৫২টি সংস্করণ প্রকাশিত হয় এবং বইটির ৩৫ লক্ষেরও বেশি কপি পাঠকদের কাছে পৌঁছে যায়। ১৮৬৯-১৮৮০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এই ১২ বছরের মধ্যে ৪১ লক্ষেরও বেশি শিশুশিক্ষার বই ছাপা হয়।
[6] অন্যান্য পাঠ্যবই প্রকাশ: বিদ্যালয় স্তরের বিভিন্ন বিষয়ের প্রচুর পাঠ্যবই ছাপাখানাগুলিতে মুদ্রিত হয়ে সস্তায় বাংলার সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের হাতে পৌঁছে যায়। এরূপ কিছু উল্লেখযোগ্য পাঠ্যবই ছিল গোবিন্দপ্রসাদ দাস রচিত ‘ব্যাকরণ সার’, প্রাণলাল চক্রবর্তী রচিত ‘অঙ্কবোধ’, কেদারেশ্বর চক্রবর্তী রচিত ‘বাঙ্গালার ইতিহাস’, আনন্দকিশোর সেন রচিত ‘অর্থের সার্থকতা’, দীননাথ সেন রচিত ‘বাংলাদেশ ও আসামের সংক্ষিপ্ত বিবরণ’ এবং ‘ঢাকা জেলার ভূগোল এবং সংক্ষেপে ঐতিহাসিক বিবরণ’ প্রভৃতি। এইসব বইপত্র বাংলার গ্রামগঞ্জে শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
[7] সংবাদপত্রের ভূমিকা: ঊনবিংশ শতকে বাংলার ছাপাখানাগুলি থেকে বেশ কয়েকটি সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়ে বাংলায় গণশিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এসব সংবাদপত্রের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল মার্শম্যান সম্পাদিত মাসিক ‘দিগদর্শন’ ও সাপ্তাহিক ‘সমাচার দর্পণ’, গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য সম্পাদিত ‘বেঙ্গল গেজেট, রামমোহন রায় সম্পাদিত ‘সম্বাদ কৌমুদী, ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত সম্পাদিত ‘সম্বাদ প্রভাকর’, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পাদিত ‘তত্ত্ববোধিনী’ প্রভৃতি।
ক্লিক করুন দশম শ্রেণির ইতিহাস এর সমস্ত অধ্যায় অনুযায়ী তার সব প্রশ্নের উত্তর